Category: সম্পাদকীয়

  • নববর্ষের অঙ্গীকার: পরিবর্তনের পথে বাংলাদেশ

    নববর্ষের অঙ্গীকার: পরিবর্তনের পথে বাংলাদেশ

    নতুন সূর্যের প্রথম আলোয় শুরু হলো বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। সময়ের অনিবার্য প্রবাহে আরেকটি বছর পেরিয়ে আমরা প্রবেশ করলাম নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে। পহেলা বৈশাখ আমাদের কেবল উৎসবের আনন্দই দেয় না, এটি আমাদের আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং নতুন করে পথচলার অঙ্গীকারের সুযোগ করে দেয়।

    গত বছরের অর্জন যেমন আমাদের গর্বিত করে, তেমনি নানা ব্যর্থতা ও সংকট আমাদের ভাবায়। সমাজের নানা স্তরে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও বৈষম্য এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ আজও আমাদের প্রধান দাবি।

    এই বাস্তবতায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম কেবল তথ্য পরিবেশনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সত্য তুলে ধরা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠাই তার মূল দায়িত্ব। সাপ্তাহিক পথিকৃৎ সেই দায়িত্ব পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ।

    নতুন বছরে আমাদের প্রত্যাশা—দেশ এগিয়ে যাবে ন্যায়, সততা ও মানবিকতার পথে। উন্নয়ন যেন কেবল পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটি মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীলতা, উদ্যোগ ও দেশপ্রেমই হতে পারে আগামীর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।নববর্ষের এই শুভক্ষণে আসুন আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই—নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করব, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাব এবং একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলব।

    নতুন বছর সবার জীবনে বয়ে আনুক শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ—এই কামনায়। শুভ নববর্ষ ১৪৩৩।

    সম্পাদকীয় বিভাগ, সাপ্তাহিক পথিকৃৎ।

  • শুধু উচ্চশিক্ষা নয়, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হোক আগামী প্রজন্ম

    শুধু উচ্চশিক্ষা নয়, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হোক আগামী প্রজন্ম

    বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়—সন্তানকে বড় করে তুলতে হবে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা উচ্চপদস্থ কোনো কর্মকর্তা হিসেবে। যেন সফলতার সংজ্ঞা সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে কয়েকটি পেশার মধ্যেই। কিন্তু এই দৌড়ের ভিড়ে আমরা একটি মৌলিক বিষয় প্রায় ভুলেই যাচ্ছি—আমরা কি আমাদের সন্তানদের সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারছি?

    বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এই দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অথচ আজকের সমাজে খুব কম বাবা-মাকেই দেখা যায় যারা তাদের সন্তানকে একজন দক্ষ কৃষক হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন। বরং কৃষিকে অনেকেই অবহেলার চোখে দেখেন। অথচ দেশের উন্নয়নে কৃষকের অবদান অপরিসীম।

    অন্যদিকে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের উপর পড়াশোনার অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকেই তাদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বইয়ের ভার। শুরুতে বই তাদের কাছে আনন্দের বিষয় হলেও ধীরে ধীরে সেটিই হয়ে ওঠে মানসিক চাপের কারণ। খেলাধুলা, সৃজনশীলতা ও স্বাভাবিক শৈশবের আনন্দ থেকে তারা বঞ্চিত হয়।

    স্কুলে প্রথম হওয়ার প্রতিযোগিতা, কোচিং ও প্রাইভেট পড়ার চাপ—সব মিলিয়ে অনেক শিশুর কাছে পড়াশোনা আনন্দের নয়, বরং এক ধরনের মানসিক যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়ায়। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রেই বাবা-মা সন্তানের উপর এমন চাপ সৃষ্টি করেন যা তাদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

    এক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের কাছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাখা দরকার। আমরা কি কখনো আমাদের সন্তানদের ইচ্ছা বা মতামতকে গুরুত্ব দিই? আমরা কি কখনো তাদের বলি—“প্রথম হওয়া জরুরি নয়, একজন ভালো মানুষ হওয়াই সবচেয়ে বড় সাফল্য”?

    শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল উচ্চ ডিগ্রি অর্জন নয়; বরং একজন মানুষকে নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ করে তোলা। একজন মানুষ তখনই প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত হয়ে ওঠে, যখন সে সমাজ, দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা ধারণ করে।

    সন্তানদের উপর জোর করে নির্দিষ্ট বিষয় চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তাদের আগ্রহ ও মেধাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কেউ বিজ্ঞান পড়তে চাইবে, কেউ ব্যবসায় শিক্ষা, আবার কেউ মানবিক বিষয়ে আগ্রহী হবে—এটাই স্বাভাবিক। সন্তানের পছন্দকে সম্মান জানিয়ে তাকে সেই পথেই এগিয়ে যেতে সুযোগ করে দেওয়াই একজন সচেতন অভিভাবকের দায়িত্ব।

    সন্তানদের শুধু অর্থ উপার্জনের শিক্ষা নয়, বরং মানুষের জন্য কাজ করার শিক্ষা দিতে হবে। তাদের শেখাতে হবে সততা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের মূল্যবোধ। কারণ একজন মানুষ কেবল বড় পদে অধিষ্ঠিত হলেই মহান হয় না; মহান হয় তার চরিত্র, মানবিকতা ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে।

    আজ সময় এসেছে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানোর। সন্তানদের শুধু উচ্চশিক্ষিত নয়, সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। কারণ একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে কেবল বড় বড় ডিগ্রিধারী মানুষের উপর নয়, বরং সৎ, মানবিক ও সুশিক্ষায় শিক্ষিত নাগরিকদের উপর।

    যেদিন আমরা সন্তানদের প্রথম হওয়ার প্রতিযোগিতা নয়, বরং মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিতে পারব—সেদিনই এই দেশ সত্যিকার অর্থে সোনার বাংলায় পরিণত হবে।