ধারাবাহিক পর্বের প্রথম পর্ব
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
গত বছরের ৫ আগষ্ট ছাত্র জনতার আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলেও অধিকাংশ সরকারি দপ্তরে বহাল তবিয়তে রয়েছেন স্বৈরাচারের দোসররা। কোনভাবেই তাদের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। খোলস পাল্টে নিজেদের হাতেই দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ রেখেছে তারা। কুষ্টিয়া জেলা পরিষদও এর ব্যতিক্রম নয়। জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী স্বৈরাচারের দোসর শফিকুল আজম তাদেরই একজন। বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, ১৫ বছর ধরে জেলা পরিষদ কুষ্টিয়ায় ডেপুটেশনে কর্মরত আছেন সহকারী প্রকৌশলী শফিকুল আজম। স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরের শাসনামলে কুষ্টিয়া-২ (ভেড়ামারা-মিরপুর) আসনের সাবেক এমপি কামরুল আরফিনের বিয়াই পরিচয় দিতেন তিনি। এমপির বিয়াই পরিচয় দিয়ে নিয়োগ বাণিজ্য, ঘুষ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্যসহ নানা ধরনের অনিয়ম দুর্নীতির সাথে নিজেকে জড়িয়ে বনে গেছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। গড়েছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। এমনকি কামারুল আরেফিনের ব্যবসায়ীক পার্টনারও ছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় তার বিরুদ্ধে কোন কর্মকর্তা কর্মচারী মুখ খুলতে সাহস পায়নি। মুখ খুললেই নিশ্চিত বিপদ জেনে এ কাজটি করার সাহসও কেউ দেখায়নি। স্বৈরাচারের পতন হবার কিছুদিন যেতে না যেতেই খোলস পাল্টে ফেলেছেন শফিকুল আজম। বিএনপির একাধিক নেতৃবৃন্দের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে নিজের হাতেই রেখেছেন জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণ। এমনকি পূর্ববর্তী সরকারের আমলে গড়ে তোলা অবৈধ সম্পদের পাহাড় ও নানা অনিয়ম দুর্নীতির প্রমাণ ম্যানেজ সিস্টেম ব্যবহার করে ফাইলবন্দী করে রেখেছেন তিনি। আজমের অপকর্মের ইতিহাসগুলো পর্বাকারে তুলে ধরা হচ্ছে। আপন বোনের ছেলেকে জেলা পরিষদ কুষ্টিয়ায় সাঁটলিপিকার পদে নিয়োগ দিয়ে আইন বহির্ভূতভাবে বানিয়েছিলেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা। যদিও একাধিক গণমাধ্যমে এই সংবাদটি ফলাও করে প্রকাশের পর প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুঃখের বিষয়, নিজের ভাগ্নেকে নিয়োগ দিতেও ২০ লক্ষ টাকা নিয়েছেন শফিকুল আজম। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৯ সালে ২০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে ভাগ্নে মোঃ নাসমুদ্দোহাকে জেলা পরিষদের সাঁটলিপিকার পদে চাকুরী দেন সহকারী প্রকৌশলী শফিকুল আজম। ঐ নিয়োগ বোর্ডের সদস্য সচিব ছিলেন তিনি। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে খুব সহজেই ভাগ্নেকে পরীক্ষার প্রশ্ন সরবরাহ করেন আজম। সেই প্রশ্নে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মেধা তালিকায় স্থান করে নেন ভাগ্নে নাসমুদ্দোহা। মামার জোরে চূড়ান্ত তালিকায়ও স্থান পান তিনি। সরকারি চাকুরিতে নিয়োগ পেতে যে বয়সসীমা নির্ধারণ করা আছে সেই বয়সসীমার খুব কাছাকাছি ছিলেন ভাগ্নে নাসমুদ্দোহা। সেজন্য তড়িঘড়ি করে চাকুরি নিতে মামাসহ তৎকালীন স্থানীয় সরকারের উপ- পরিচালক মৃনাল কান্তি দে, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হাজী রবিউল ইসলাম ও নির্বাহী কর্মকর্তা মুন্সী মনিরুজ্জামানকে ২০ লক্ষ টাকা ঘুষ হিসেবে দিতে হয় তাকে। ঐ টাকার একটি অংশ নিজেও নিয়েছেন আজম। মামার জোরে চাকুরি পাওয়ার মাত্র ৩ বছরের মধ্যে নিয়ম বহির্ভূতভাবে সাঁটলিপিকার থেকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা বনে গেছেন নাসমুদ্দোহা। ২০২২ সালে তৎকালীন প্রশাসনিক কর্মকর্তা অবসরে গেলে আইন বহির্ভূতভাবে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় আজমের ভাগ্নে নাসমুদ্দোহাকে। তৎকালীন নির্বাহী কর্মকর্তা মুন্সি মনিরুজ্জামান তার শেষ কর্মদিবসে নিয়ম বহির্ভূতভাবে নাসমুদ্দোহাকে দায়িত্ব দিয়ে যান। যদিও নিয়ম রয়েছে, প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে দায়িত্ব পালন করতে হলে একজন কর্মকর্তাকে নিম্নমান সহকারী পদে ৩ বছর, উচ্চমান সহকারী পদে ৩ বছর ও প্রধান সহকারী পদে ৫ বছর চাকুরি করার অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। তাছাড়া সাঁটলিপিকার থেকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পেতে গেলে অবশ্যই ১০ বছর চাকুরিরত থাকার নিয়ম রয়েছে। তবে নাসমুদ্দোহাকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দিতে এসব কোন নিয়মই মানা হয়েছিল না। এই শফিকুল আজম শুধুমাত্র ভাগ্নেকে নিয়োগ দিয়ে বাণিজ্য করেননি এমন অনেকের থেকে টাকা নিয়ে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। সরকারি চাকুরি বিধি বহির্ভূতভাবে ঠিকাদারদের সাথে ব্যবসা ছিল তার। জেলা পরিষদের ১০ তলা ভবন নির্মাণের সাথে জড়িত বিভিন্ন পন্থায় অবৈধভাবে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। পর্বাকারে সেগুলো পাঠকের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হবে।
প্রসঙ্গে জেলা পরিষদ কুষ্টিয়ার সহকারী প্রকৌশলী শফিকুল আজমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।