Pathikrit Most Popular Online NewsPaper

    কুষ্টিয়া অফিসঃ

    কুষ্টিয়া জেলা শহরের কাটাইখানা মোড় সংলগ্ন আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনের একটি বড় অংশজুড়ে গড়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ একটি শিল্পকারখানা—মেসার্স মোল্লা মেটাল এ্যালুমিনিয়াম ওয়ার্কস। বিদ্যালয়ের গা ঘেঁষে জনবহুল এলাকায় স্থাপিত এই কারখানাটি বর্তমানে অগ্নিকাণ্ডসহ বহুমুখী ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে কোমলমতি শিক্ষার্থীসহ আশপাশের মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

    সরেজমিনে দেখা যায়, কারখানাটিতে বিভিন্ন সাইজের মেটাল গামলা, হাড়িসহ নানা পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শিশু শ্রমিকদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে, যা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। জানা গেছে, প্রায় ১৫-১৬ বছর আগে একই স্থানে এ ধরনের একটি কারখানা স্থাপন করা হলেও বিদ্যালয়ের নিকটবর্তী হওয়ায় তা বন্ধ হয়ে যায়। তবে প্রায় সাত মাস আগে আমির হামজাসহ কয়েকজন ব্যক্তি মিলে পুনরায় কারখানাটি চালু করেন।

    কারখানার ভেতরে উৎপাদিত পণ্যগুলো এসিড মিশ্রিত পানিতে ঘষে পরিষ্কার করা হচ্ছে। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের জানালার একেবারে পাশে বসে কয়েকজন নারী শ্রমিক এ কাজ করছেন। অসহনীয় দুর্গন্ধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে তারা শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে কাজ করলেও পাশের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা কোনো সুরক্ষা ছাড়াই পাঠ গ্রহণ করছে। ফলে প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েই চলেছে।

    স্থানীয়রা জানান, এসিডের গন্ধ ও ধোঁয়ার কারণে অনেক সময় শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে এবং স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যালয়ের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও অভিযোগ ওঠে। এছাড়া কারখানাটিতে অগ্নি নির্বাপণের কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই। নেই ফায়ার এক্সটিংগুইশার বা জরুরি নির্গমন পথের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। ফলে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

    সংবাদ সংগ্রহকালে কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও কলকারখানা অধিদপ্তরের লাইসেন্স সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা সব লাইসেন্স থাকার দাবি করলেও কোনো কাগজপত্র দেখাতে রাজি হননি। এতে করে বৈধতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—বিদ্যালয়ের গা ঘেঁষে এমন ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা কীভাবে অনুমোদন পেল?

    এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলী জানান, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ করেছেন। গত বছরের ৬ মে তারিখে জমা দেওয়া একটি আবেদনপত্রে বিষয়টি উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. মোস্তফা মাহমুদও ওই আবেদনের পক্ষে সুপারিশ করেন।

    আবেদনপত্রের অনুলিপি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হলেও প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

    আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়, কারখানা থেকে সৃষ্ট উচ্চ শব্দ ও দুর্গন্ধ শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে পাঠ গ্রহণে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছে বলেও জানানো হয়। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়।

    বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকা “নীরব এলাকা” হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় সেখানে উচ্চ শব্দ সৃষ্টি করা আইনত দণ্ডনীয়। একই সঙ্গে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করে পরিবেশ দূষণ ঘটানোও অপরাধ। এছাড়া শিশু শ্রম ব্যবহার এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে শ্রমিকদের কাজ করানোও শ্রম আইনের লঙ্ঘন।

    জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকেও বিদ্যালয়ের পাশে এ ধরনের কারখানা বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুর্গন্ধ, ধোঁয়া ও রাসায়নিক বাষ্প শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং এটি জনদুর্ভোগ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

    স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত এই কারখানার কার্যক্রম বন্ধ বা নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের দাবি জানিয়েছে। অন্যথায় যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

    এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী ও অভিভাবকরা।

    কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এমদাদুল হক বলেন, আবাসিক এলাকা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে এ ধরনের শিল্পকারখানা স্থাপনের কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে যেখানে অ্যালুমিনিয়াম ফ্যাক্টরি থাকে, সেখানে অনিবার্যভাবে শব্দদূষণ সৃষ্টি হয়, যা শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটায়। তাই এ ধরনের কার্যক্রম আমরা অনুমোদন করি না। এছাড়া, যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে অ্যালুমিনিয়াম গলিয়ে তৈজসপত্র তৈরি করা হয়, সেটিও এই ধরনের সংবেদনশীল এলাকায় স্থাপনের কোনো সুযোগ নেই।

    কুষ্টিয়া সদর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সৈয়দা নাজনীন আলম বলেন, সংশ্লিষ্ট স্কুল থেকে তাদের কাছে কোনো দরখাস্ত জমা পড়েছিল কিনা তা এই মুহূর্তে তার সঠিকভাবে মনে নেই। তিনি জানান, সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে দরখাস্ত পাওয়া গেলে তা জেলা শিক্ষা অফিসার বরাবর প্রেরণ করা হয় এবং এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রশাসনের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে তিনি ছুটিতে রয়েছেন, বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে পরে বিস্তারিত জানাতে পারবেন।

    এদিকে কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর কাজী আরিফুল হক জানান, প্রতিষ্ঠানটি ফায়ার লাইসেন্স এ বছর আপডেট করেনি। বিদ্যালয়ের গা ঘেঁষে প্রতিষ্ঠানটি কিভাবে চলছে? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, এগুলো পরিবেশ অধিদপ্তর বলতে পারে। তবে ঐ প্রতিষ্ঠানটি তিনি পুনরায় ভিজিট করে বিষয়গুলো দেখবেন বলে জানিয়েছেন। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর কুষ্টিয়ার শ্রম পরিদর্শক (সাধারণ) মো. ইশতিয়াক আহম্মেদ জানান, তাঁর জানামতে প্রতিষ্ঠানটির কোনো বৈধ কলকারখানার অনুমতি নেই। তবে তিনি বিষয়টি নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত নন। তিনি আরও জানান, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সম্ভবত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সঠিক তথ্য কাগজপত্র পর্যালোচনা করে আগামী রবিবার জানাতে পারব।

    Spread the love