Pathikrit Most Popular Online NewsPaper

নিজস্ব প্রতিনিধি:

কুষ্টিয়ার কবুরহাট এলাকায় অষ্টমবারের মতো শুরু হয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা। সংবাদভিত্তিক জনপ্রিয় ফেসবুক পেজ ‘আপডেট কুষ্টিয়া’র আয়োজনে এবং আন্দোলনের বাজার অনলাইন, দৈনিক খবরওয়ালা, সাপ্তাহিক পথিকৃৎ ও পলিন ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় তিন দিনব্যাপী এ খেলার আয়োজন করা হয়েছে।

শনিবার (২৪ অক্টোবর ২০২৬) প্রথম দিনের খেলার উদ্বোধন করেন ‘আপডেট কুষ্টিয়া’র অ্যাডমিন ও সাংবাদিক অর্পণ মাহমুদ, কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবু মনি জুবায়েদ রিপন, সাপ্তাহিক পথিকৃৎ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শাহারিয়া ইমন রুবেল, পলিন ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক আবু মনি সাকলায়েন এলিন, বাংলাদেশ লাঠিয়াল বাহিনীর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আলাউদ্দিন, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহিনা সুলতানা ডিজু, অর্থ সম্পাদক সাব্বির হাসান চৌধুরী রাতুল, কবুরহাটের সমাজ প্রধান সাইদুল ইসলাম বিশ্বাস, আবুল হোসেনসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

দৈনিক আন্দোলনের বাজার পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার ও ‘আপডেট কুষ্টিয়া’ পেজের হেড অব অ্যাডমিন অর্পণ মাহমুদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং ওস্তাদ জানার আলীর পরিচালনায় এবারের আয়োজনে তিনজন বাদ্যযন্ত্রশিল্পীসহ বিভিন্ন বয়সী প্রায় দেড় শতাধিক লাঠিয়াল অংশ নিচ্ছেন। সুস্থ ধারার সামাজিক বিনোদন নিশ্চিত করা ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে প্রতিবছর হেমন্তে ধান পাকার আগে এ খেলার আয়োজন করা হয় বলে জানান আয়োজক অর্পণ মাহমুদ।

লাঠিখেলাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়েছে। তিন দিনের এ আয়োজনে বাদ্যের তালে তালে লাঠিয়ালদের নাচ, আক্রমণ ও আত্মরক্ষার নানা কৌশল দর্শকদের মুগ্ধ করছে। লাঠিয়ালরা দলবদ্ধভাবে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে খোলা মাঠে তাদের কসরত প্রদর্শন করবেন। ঐতিহ্যবাহী এ খেলা দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে ছুটে আসছেন সাধারণ মানুষ।

সরেজমিনে দেখা যায়, কালের বিবর্তনে একসময় সামন্তপ্রভুদের খাজনা আদায় ও নিরাপত্তার কাজে ব্যবহৃত লাঠি এখন গ্রামবাংলার মানুষের বিনোদনের অন্যতম উপকরণ হয়ে উঠেছে। লাঠিয়ালদের কলাকৌশলও বেশ নজরকাড়া। প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে এক পক্ষ নানা কৌশলে লাঠি চালাচ্ছে, অন্য পক্ষ আত্মরক্ষায় ব্যবহার করছে বিভিন্ন কৌশল। সব মিলিয়ে এটি যেন আনন্দঘন এক প্রতীকী যুদ্ধ।

লাঠিয়াল সাদেক আলী বলেন, “পারিবারিকভাবেই আমরা লাঠিখেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাপ-দাদার কাছ থেকে এ খেলার শিক্ষা পেয়েছি। এ ঐতিহ্যবাহী খেলা দেখে দর্শকেরা যেমন আনন্দ পান, তেমনি এর মাধ্যমে আত্মরক্ষার নানা কৌশলও শেখা যায়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা খেলাটি টিকিয়ে রেখেছি। এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারি সহযোগিতা জরুরি।”

লাঠিখেলা দেখতে আসা দর্শক সাদেক আলী বলেন, “শুনেছি, একসময় আউশ ধান কাটার মৌসুম শেষ হলে গ্রামের মানুষ লাঠিখেলায় মেতে উঠতেন। বাড়ির উঠান কিংবা ধানের খলায় বসত এ খেলার আসর। আগে কুষ্টিয়াসহ আশপাশের জেলাগুলোর প্রায় প্রতিটি গ্রামেই অন্তত একটি লাঠিয়াল দল ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খেলাটি প্রায় বিলুপ্তির পথে। তাই কুষ্টিয়ায় তিন দিনব্যাপী লাঠিখেলা উৎসবের খবর শুনে শেষ দিনে ছুটে এসেছি।”

কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু মনি জুবায়েদ রিপন বলেন, “লাঠিখেলা দেখে আমি মুগ্ধ। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা মাদক ও মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। যুবসমাজকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে হলে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো টিকিয়ে রাখতে হবে। এমন সুন্দর আয়োজনের জন্য আয়োজক অর্পণ মাহমুদকে ধন্যবাদ জানাই। খেলাটি টিকিয়ে রাখতে সবাইকে পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।”

খেলা আয়োজক কমিটির সদস্য, রাশিদা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও সাপ্তাহিক পথিকৃৎ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শাহারিয়া ইমন রুবেল বলেন, “কালের বিবর্তনে বিলুপ্তপ্রায় এ লাঠিখেলা টিকিয়ে রাখতে হলে লাঠিয়ালদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি। প্রতিবছর এ উৎসবের আয়োজনের মাধ্যমে একদিকে লাঠিয়ালদের উৎসাহিত করা হয়, অন্যদিকে গ্রামবাসীর বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়। নতুন প্রজন্ম যেন এ খেলা সম্পর্কে জানতে পারে, সে জন্য এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করব।”

আয়োজক কমিটির সার্বিক তত্ত্বাবধায়ক ও গণমাধ্যমকর্মী অর্পণ মাহমুদ বলেন, “কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকায় আবহমানকাল ধরে বিনোদনের খোরাক জুগিয়ে আসছে লাঠিখেলা। মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতে এবং বর্তমান প্রজন্মকে মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত আসক্তি থেকে ফেরাতে এ ধরনের ঐতিহ্যবাহী খেলা টিকিয়ে রাখা জরুরি।”

খেলার পরিচালক জানার আলী সর্দারসহ প্রবীণ লাঠিয়ালরা জানান, তাঁরা প্রায় দুই যুগ ধরে বিভিন্ন এলাকায় লাঠিখেলা প্রদর্শন করে আসছেন। তবে এ খেলার সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই দরিদ্র। নানা দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে তাঁদের জীবনযাপন করতে হয়। তাঁদের জন্য সরকারি বা বেসরকারিভাবে তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা নেই। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে নিয়মিত চর্চা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ খেলাকে আরও বড় পরিসরে মানুষের সামনে তুলে ধরা সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তাঁরা।

খেলার বিরতিতে অংশগ্রহণকারী ও অতিথিদের জন্য কলাপাড়ায় ভোজের আয়োজন করা হয়।