Pathikrit Most Popular Online NewsPaper

    বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়—সন্তানকে বড় করে তুলতে হবে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা উচ্চপদস্থ কোনো কর্মকর্তা হিসেবে। যেন সফলতার সংজ্ঞা সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে কয়েকটি পেশার মধ্যেই। কিন্তু এই দৌড়ের ভিড়ে আমরা একটি মৌলিক বিষয় প্রায় ভুলেই যাচ্ছি—আমরা কি আমাদের সন্তানদের সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারছি?

    বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এই দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অথচ আজকের সমাজে খুব কম বাবা-মাকেই দেখা যায় যারা তাদের সন্তানকে একজন দক্ষ কৃষক হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন। বরং কৃষিকে অনেকেই অবহেলার চোখে দেখেন। অথচ দেশের উন্নয়নে কৃষকের অবদান অপরিসীম।

    অন্যদিকে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের উপর পড়াশোনার অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকেই তাদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বইয়ের ভার। শুরুতে বই তাদের কাছে আনন্দের বিষয় হলেও ধীরে ধীরে সেটিই হয়ে ওঠে মানসিক চাপের কারণ। খেলাধুলা, সৃজনশীলতা ও স্বাভাবিক শৈশবের আনন্দ থেকে তারা বঞ্চিত হয়।

    স্কুলে প্রথম হওয়ার প্রতিযোগিতা, কোচিং ও প্রাইভেট পড়ার চাপ—সব মিলিয়ে অনেক শিশুর কাছে পড়াশোনা আনন্দের নয়, বরং এক ধরনের মানসিক যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়ায়। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রেই বাবা-মা সন্তানের উপর এমন চাপ সৃষ্টি করেন যা তাদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

    এক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের কাছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাখা দরকার। আমরা কি কখনো আমাদের সন্তানদের ইচ্ছা বা মতামতকে গুরুত্ব দিই? আমরা কি কখনো তাদের বলি—“প্রথম হওয়া জরুরি নয়, একজন ভালো মানুষ হওয়াই সবচেয়ে বড় সাফল্য”?

    শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল উচ্চ ডিগ্রি অর্জন নয়; বরং একজন মানুষকে নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ করে তোলা। একজন মানুষ তখনই প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত হয়ে ওঠে, যখন সে সমাজ, দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা ধারণ করে।

    সন্তানদের উপর জোর করে নির্দিষ্ট বিষয় চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তাদের আগ্রহ ও মেধাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কেউ বিজ্ঞান পড়তে চাইবে, কেউ ব্যবসায় শিক্ষা, আবার কেউ মানবিক বিষয়ে আগ্রহী হবে—এটাই স্বাভাবিক। সন্তানের পছন্দকে সম্মান জানিয়ে তাকে সেই পথেই এগিয়ে যেতে সুযোগ করে দেওয়াই একজন সচেতন অভিভাবকের দায়িত্ব।

    সন্তানদের শুধু অর্থ উপার্জনের শিক্ষা নয়, বরং মানুষের জন্য কাজ করার শিক্ষা দিতে হবে। তাদের শেখাতে হবে সততা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের মূল্যবোধ। কারণ একজন মানুষ কেবল বড় পদে অধিষ্ঠিত হলেই মহান হয় না; মহান হয় তার চরিত্র, মানবিকতা ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে।

    আজ সময় এসেছে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানোর। সন্তানদের শুধু উচ্চশিক্ষিত নয়, সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। কারণ একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে কেবল বড় বড় ডিগ্রিধারী মানুষের উপর নয়, বরং সৎ, মানবিক ও সুশিক্ষায় শিক্ষিত নাগরিকদের উপর।

    যেদিন আমরা সন্তানদের প্রথম হওয়ার প্রতিযোগিতা নয়, বরং মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিতে পারব—সেদিনই এই দেশ সত্যিকার অর্থে সোনার বাংলায় পরিণত হবে।

    Spread the love