
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুষ্টিয়া জেলা ও উপজেলা কমিটিতে চরম স্বজনপ্রীতি, একনায়কতন্ত্র এবং অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে পকেট কমিটি গঠনের একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সংগঠক নয়ন আহমেদের বিরুদ্ধে। দলীয় উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কিংবা ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র এই কেন্দ্রীয় নেতার ‘বিশেষ আশীর্বাদে’ এক পরিবারের তিন আপন ভাই জেলা ও দুই উপজেলার প্রধান সমন্বয়কের পদ বাগিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাংশ। এই ‘ভাই-ভাই’ কমিটির কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বিষয়টি কেন্দ্রীয়ভাবে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তবে বর্তমান বিভিন্ন স্তরের একাংশের নেতাকর্মীদের মতে, নয়ন আহমেদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ উত্থাপিত হলেও এখন পর্যন্ত দলীয় বা আইনি কোনো ফোরামে তা প্রমাণিত হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক নয়ন আহমেদের (বাসা: মিরপুর, কুষ্টিয়া) একক প্রভাবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারে কোনো রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়াই এক ব্যক্তি কুষ্টিয়া জেলা এনসিপির প্রধান সমন্বয়ক পদ পেয়েছেন বলে ক্ষোভ রয়েছে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, জেলা প্রধান সমন্বয়কের আপন এক ভাই পেয়েছেন ভেড়ামারা উপজেলার প্রধান সমন্বয়কের পদ এবং অপর এক ভাই পেয়েছেন মিরপুর উপজেলার প্রধান সমন্বয়কের পদ; যদিও তাদের মূল বাড়ি ভেড়ামারা এলাকায়। দলীয় সূত্রে প্রকাশ, কেন্দ্রীয় নেতা নয়ন আহমেদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভেড়ামারার শোভন আহমেদের বড় ভাই হলেন এই জেলা প্রধান সমন্বয়ক। অর্থাৎ, নয়ন আহমেদ তার বন্ধুপ্রীতির কারণে একই পরিবার থেকে তিন ভাইকে জেলা ও দুই উপজেলার শীর্ষ পদে বসিয়েছেন বলে তীব্র অভিযোগ উঠেছে।
নয়নের বিরুদ্ধে নানামুখী অভিযোগ ও তদন্তের
দাবিসামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ দলের অভ্যন্তরে জোরালো অভিযোগ উঠেছে, মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন বা ‘কমিটি বাণিজ্যের’ মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সংগঠক নয়ন আহমেদ এই পকেট কমিটি দিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা কমিটির এক নেতা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কেন্দ্রীয় নেতা নয়ন আহমেদের ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে কুষ্টিয়ায় সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা এনসিপি করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। তিনি যাদের পদ দিয়েছেন, সেই তিন ভাই প্রধান সমন্বয়কের কেউই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ছিলেন না। অভিযোগ উঠেছে, শুধুমাত্র নয়ন আহমেদের ব্যক্তিগত আর্থিক ও স্বার্থগত এজেন্ডার কারণে এদের জেলার নেতৃত্ব দিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং একটি পুরো পরিবারকে দলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই কেন্দ্র থেকে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে এই গুরুতর অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হোক এবং সত্য প্রমাণিত হলে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
সাংগঠনিক ব্যর্থতা, একক নিয়ন্ত্রণ ও ‘ট্যাগিং’ আতঙ্ক
দলীয় সূত্রমতে, কুষ্টিয়া জেলা এনসিপির সমন্বয়ক কমিটি গঠনের সাথে সাথে কেন্দ্র থেকে ৩টি উপজেলা কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও এই সমন্বয়ক কমিটি অন্য কোনো উপজেলা বা পৌরসভা কমিটি গঠন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। জেলা কমিটির একাংশের অভিযোগ, নয়ন আহমেদের আশ্রয়ে থাকা প্রধান সমন্বয়কারীর দম্ভ ও দুর্ব্যবহারের কারণে ত্যাগী ও সাধারণ নেতাকর্মীরা দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।পাশাপাশি অভিযোগ রয়েছে, জেলা বা উপজেলা কমিটিগুলো স্বাধীনভাবে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারছে না। কেন্দ্রীয় সংগঠক নয়ন আহমেদ নিজেই কুষ্টিয়ায় এসে সবকিছু এককভাবে স্বৈরাচারী কায়দায় নিয়ন্ত্রণ করেন। তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা সিদ্ধান্তের বাইরে গেলেই স্থানীয় নেতাদের বিভিন্ন ‘ট্যাগ’ বা অপবাদ দিয়ে কমিটি থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার হুমকি ও বহিষ্কারের ঘটনা ঘটাচ্ছেন তিনি।এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুষ্টিয়া জেলা ও বিভিন্ন স্তরের সাধারণ নেতাকর্মীদের সাথে কথা বললে ভিন্ন এক চিত্রও উঠে আসে। বর্তমান কমিটির একাধিক স্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মতে, “রাজনৈতিক মাঠে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সংগঠক নয়ন আহমেদের বিরুদ্ধে একনায়কতন্ত্র, স্বজনপ্রীতি বা কমিটি বাণিজ্যের মতো যেসব মুখরোচক অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তার একটিরও এখন পর্যন্ত কোনো সত্যতা বা প্রমাণ মেলেনি। দল গোছানোর প্রক্রিয়ায় বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে অনেকেই এই ধরণের অপপ্রচার চালাতে পারেন।”
তারা আরও জানান, “যেহেতু অভিযোগগুলো দলের শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে এবং এতে সংগঠনের ভাবমূর্তি জড়িত, তাই আমরা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে জোরালো দাবি জানাচ্ছি যেন অতি দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তের মাধ্যমে যদি নয়ন আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক লেনদেন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। আর যদি অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে অপপ্রচারকারীদের চিহ্নিত করে দল থেকে বহিষ্কার করা হোক; যাতে কুষ্টিয়ার মতো রাজনৈতিক উর্বর জেলায় এনসিপির ভবিষ্যৎ ব্যাহত না হয়।”
এদিকে সার্বিক বিষয় খোঁজ নেওয়ার জন্য নয়নের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি কলটি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।