
নিজস্ব প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া :
সরকারি চাল সংগ্রহ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ায় গড়ে উঠেছে প্রভাবশালী মিল মালিকদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট—এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় মিলারদের পক্ষ থেকে। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন প্রভাবশালী মিল মালিক ছোট ও সাধারণ মিলারদের লাইসেন্স নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কাগজে-কলমে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে অতিরিক্ত সরকারি বরাদ্দ হাতিয়ে নিচ্ছেন। এতে প্রকৃত মিলাররা বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারি খাদ্য সংগ্রহ ব্যবস্থায় বাড়ছে অস্বচ্ছতা ও অনিয়ম।
বাংলাদেশ সরকার প্রতি বোরো মৌসুমে দেশের বিভিন্ন জেলার রাইস মিল থেকে নির্ধারিত দামে চাল সংগ্রহ করে সরকারি গুদামে মজুত করে। দেশের অন্যতম বৃহৎ চালের মোকাম কুষ্টিয়ায় চলতি বোরো মৌসুমে ১৯০টি রাইস মিল থেকে ৩৭ হাজার ৭৪৬ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বরাদ্দ কার্যক্রম শুরুর আগেই বিভিন্ন মিলের লাইসেন্স সংগ্রহ করে অতিরিক্ত বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় একাধিক মিলার অভিযোগ করেন, সরকারি গুদামে চাল সরবরাহ করতে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে তাদের। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লাইসেন্স জমা দিলে বেশি বরাদ্দ পাওয়া যায় বলেও দাবি করেন তারা।
আরব বাংলা রাইস মিলের মালিক আব্দুর রহমান বলেন, “সাধারণ মিলাররা এখন বরাদ্দ পেতে নানা জটিলতার মুখে পড়ছেন। বরাদ্দেও করা হচ্ছে নানা অনিয়ম।আবার সরকারী গুদামে চাল দিতে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্ত হযরত অটোমেটিক রাইস মিলের কাছে আগে থেকেই লাইসেন্স জমা দেওয়া মিলাররা তুলনামূলক বেশি বরাদ্দ পেয়েছেন। অন্যদিকে অনেক মিলার এখনো বরাদ্দ পেয়েছেন কি না, কিংবা কতটুকু পেয়েছেন—তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।
খাজানগর অটো রাইস মিলের মত অন্য মিলের উৎপাদন সক্ষমতা এক থাকলেও মিল মালিক হযরতকে লাইসেন্স দেয়ায় বরাদ্দ বেশি পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়াও মা জননী অটো রাইস মিলের পরিচালক রফিকুল ইসলামও আগেই লাইসেন্স দিয়েছে এই মিলারের কাছে। এ কারনে তিনি জানান,বরাদ্দ কত পেয়েছে জানেনিনা তিনি।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি মিল থেকে সরাসরি চাল সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে তার ব্যতিক্রম ঘটছে বলে জানান মিলাররা। তবে সাধারণ মিলারদের দাবি, কয়েক বছর ধরেই একটি সিন্ডিকেট এমন সব মিলারদের লাইসেন্স সংগ্রহ করছে, যাদের চাল সরবরাহের সক্ষমতা নেই। পরে সেই লাইসেন্স ব্যবহার করে সরকারি চাল সংগ্রহের বড় অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে। বিনিময়ে লাইসেন্সধারীদের কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা কমিশন দেওয়া হচ্ছে।কুষ্টিয়া জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন বলেন, “সরকারি চাল সংগ্রহে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। ২ মিলের একই উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্তেও বরাদ্দ বেশি পেয়েছে একাধিক মিল।”
চলতি মৌসুমে সরকার কেজিপ্রতি ৪৯ টাকা দরে চাল সংগ্রহ করছে। অথচ কুষ্টিয়ার খোলা বাজারে নতুন চাল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৪০ টাকা কেজি দরে এবং পুরোনো চাল বিক্রি হচ্ছে ৩৮ টাকার মধ্যে। অভিযোগ রয়েছে, কম দামের এই চাল বাজার থেকে কিনে কিংবা নিজস্ব মিলে পুরোনো নতুন চালের মিক্সার করে বেশি দামে সরকারকে সরবরাহ করছে সিন্ডিকেট চক্রটি।
হিসাব অনুযায়ী, কুষ্টিয়া থেকে সরকার যে পরিমাণ চাল সংগ্রহ করবে, তাতে লাইসেন্স বাণিজ্য ও অতিরিক্ত মুনাফার মাধ্যমে সিন্ডিকেটের পকেটে প্রায় কয়েক কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত অর্থ যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত হযরত অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক হযরত আলী। তিনি বলেন, “সব বরাদ্দ সরকারি নিয়ম মেনেই হয়েছে। এখানে সিন্ডিকেটের কোনো বিষয় নেই।”
সরকারি চাল সংগ্রহ কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে থাকা খাদ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাকির হোসেন বলেন, “একক কোনো মিলারের মাধ্যমে চাল সরবরাহের নিয়ম নেই। অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রতিবছর সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। শেষ পর্যন্ত সংগ্রহ করা খাদ্যের মান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। কুষ্টিয়ার মিলারদের আশঙ্কা, চলতি মৌসুমেও অনিয়ম বন্ধ না হলে সরকারি চাল সংগ্রহ কার্যক্রমে চালের মান নিয়েও নতুন করে বিতর্ক দেখা দিতে পারে।