Pathikrit Most Popular Online NewsPaper

দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি, হারুন অর রশীদঃ

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ২০২৬ সালের অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা রোগ প্রতিরোধে গবাদিপশুকে টিকা দেওয়ার কার্যক্রম ঘিরে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে টিকাদান কার্যক্রমে যুক্ত মাঠপর্যায়ের কর্মীদের বিরুদ্ধে গরুপ্রতি ২০ -৫০ টাকা এবং ছাগলপ্রতি ১০-২০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় সূত্র। এ নিয়ে খামারি ও গবাদিপশু পালনকারীদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে অভিযোগের সত্যতা, আদায়ের অর্থের প্রকৃত পরিমাণ এবং এ অর্থ নেওয়ার প্রশাসনিক অনুমোদন রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় পর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের জনবলসংকটের কথা বলা হচ্ছে। এ কারণে গ্রামপর্যায়ে টিকা প্রয়োগের জন্য মাঠকর্মী ও কথিত গ্রাম্য পশুচিকিৎসকদের কাজে লাগানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তবে তাঁদের নিয়োগের প্রক্রিয়া, যোগ্যতা, পারিশ্রমিকের কাঠামো এবং প্রাণিসম্পদ দপ্তরের অনুমোদনের বিষয়গুলো স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গরুপ্রতি ২০-৫০ও ছাগলপ্রতি ১০-২০ টাকা আদায়ের অভিযোগঅভিযোগ অনুযায়ী, দৌলতপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গবাদিপশুকে অ্যানথ্রাক্সের টিকা দেওয়ার সময় গরুপ্রতি ২০-৫০ টাকা ও ছাগলপ্রতি ১০-২০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এ অর্থ সরকারি নির্ধারিত টিকার মূল্য, টিকা প্রয়োগের পারিশ্রমিক, যাতায়াত ব্যয় নাকি অন্য কোনো খরচের জন্য নেওয়া হচ্ছে, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে টিকা প্রয়োগের জন্য নিয়োজিত কর্মীরা যদি সরকারি বেতন-ভাতার আওতাভুক্ত না হন, তাহলে তাঁদের পারিশ্রমিক কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং অর্থ আদায়ের বিষয়ে কোনো লিখিত নির্দেশনা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে প্রতিটি পশুর মালিককে টিকার মূল্য ও প্রয়োগ-সংক্রান্ত খরচের পৃথক হিসাব জানানো এবং অর্থ আদায়ের বিপরীতে রসিদ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।

কর্মকর্তার বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্যএ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তা রোকনুজ্জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি গরুপ্রতি ৮০ পয়সা এবং ছাগলপ্রতি ৩০ পয়সা নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার বক্তব্য হিসেবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গরুপ্রতি ২০ -৫০টাকা ও ছাগলপ্রতি ১০-২০ টাকা আদায়ের যৌক্তিকতা নেই বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে দপ্তরে জনবলসংকট থাকায় গ্রামপর্যায়ের কর্মীদের দিয়ে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছেন বলে অভিযোগকারীর বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

তবে বক্তব্যগুলোর পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার লিখিত বক্তব্য এবং টিকাদান কার্যক্রমের সরকারি নির্দেশনা হাতে না থাকায় অর্থ আদায়ের হার ও অনুমোদন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। এ বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।অভিযোগের বিষয়টি বোঝার জন্য একটি সম্ভাব্য হিসাব সামনে আনা যায়। ধরা যাক, কোনো টিকাদানকর্মী প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০টি গরু-ছাগলকে টিকা দেয়। সে হিসাবে ৩০ দিনে মোট টিকাদানের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০টি।

প্রতি পশুর বিপরীতে গড়ে ১০ টাকা আদায় করা হলে ৪ হাজার ৫০০টি পশুর জন্য মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৫ হাজার টাকা।

তবে এটি কেবল একটি অনুমাননির্ভর হিসাব; বাস্তবে কতটি পশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, কতটি গরু ও কতটি ছাগল রয়েছে, প্রকৃতপক্ষে কত টাকা আদায় হয়েছে এবং ওই অর্থের কত অংশ কর্মীদের পারিশ্রমিক বা অন্যান্য ব্যয়ে ব্যবহৃত হয়েছে—এসব তথ্য যাচাই ছাড়া ৪৫ হাজার টাকাকে কোনো কর্মীর প্রকৃত মাসিক আয় বা সরকারি অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

একইভাবে, ১৪টি ইউনিয়নে টিকাদান কার্যক্রমের মোট আর্থিক চিত্র জানতে হলে প্রতিটি ইউনিয়নে নিয়োজিত কর্মীর সংখ্যা, টিকাপ্রাপ্ত পশুর সংখ্যা, আদায়ের হার এবং জমা-খরচের হিসাব সংগ্রহ করতে হবে।

সরকারি নির্ধারিত মূল্য ও অতিরিক্ত খরচের প্রশ্নমৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত মাঠপর্যায়ের সেবাতথ্যে গবাদিপশুর টিকাদানের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত মূল্য উল্লেখ রয়েছে। সেখানে তড়কা বা অ্যানথ্রাক্সের টিকার মূল্যপ্রতি ১০০ মাত্রায় ৫০ টাকা হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন সরকারি তথ্যসূত্রে টিকার মূল্য ও সেবা-সংক্রান্ত হিসাবের ভিন্নতা দেখা যায়। ফলে দৌলতপুরে ২০২৬ সালের কর্মসূচিতে কার্যকর নির্ধারিত মূল্য, টিকা প্রয়োগের পারিশ্রমিক এবং যাতায়াত বা অন্যান্য খরচের অনুমোদিত হার সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছ থেকে নিশ্চিত করা জরুরি।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—টিকার সরকারি মূল্য আর টিকা প্রয়োগের জন্য নেওয়া অর্থ কি আলাদাভাবে নির্ধারিত? যদি আলাদা খরচ নেওয়ার অনুমতি থাকে, তাহলে তার লিখিত নির্দেশনা কোথায়? আর যদি নির্ধারিত হারের বাইরে অর্থ আদায় হয়ে থাকে, তাহলে তার দায় কার?

এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।জনবলসংকটের সমাধান, নাকি তদারকির ঘাটতি?প্রাণিসম্পদ দপ্তরে জনবলসংকট থাকলে মাঠপর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনায় বিকল্প কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রক্রিয়া, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব বণ্টন, পারিশ্রমিক নির্ধারণ এবং অর্থের হিসাব রাখার ব্যবস্থা স্বচ্ছ হওয়া জরুরি।

অ্যানথ্রাক্স একটি গুরুত্বপূর্ণ সংক্রামক রোগ। গবাদিপশুকে যথাযথভাবে টিকা দেওয়ার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি খামারি ও পশুপালকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও প্রয়োজন। তাই টিকাদান কার্যক্রমের উদ্দেশ্য যেন অর্থ আদায় নিয়ে বিতর্কের কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবেদৌলতপুরের ১৪টি ইউনিয়নে টিকাদান কার্যক্রম ঘিরে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের নথিপত্র পর্যালোচনা, কর্মীদের তালিকা যাচাই, টিকাপ্রাপ্ত পশুর সংখ্যা নিরূপণ এবং অর্থ আদায় ও ব্যয়ের হিসাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি টিকা প্রয়োগের জন্য কর্মীদের কোনো লিখিত নিয়োগপত্র বা অনুমোদন রয়েছে কি না, তাঁদের পারিশ্রমিক কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং পশুর মালিকদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার বিষয়ে কী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশ করা হলে বিভ্রান্তি দূর হবে।

অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ অসত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে সঠিক তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।দৌলতপুরের খামারি ও সাধারণ পশুপালকদের প্রত্যাশা, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে টিকাদান কার্যক্রম স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে সরকারি নির্ধারিত মূল্য, অনুমোদিত অতিরিক্ত খরচ এবং কর্মীদের পারিশ্রমিকের হিসাব পরিষ্কারভাবে জানানো হবে, যাতে কোনো পশুর মালিককে অযৌক্তিক অর্থ দিতে না হয়।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, ২০২৬ সালের টিকাদান কর্মসূচির লিখিত নির্দেশনা এবং ইউনিয়নভিত্তিক হিসাব পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আরও নির্ভুলভাবে হালনাগাদ করা যাবে।৭শব্দের হেডলাইন করে নিউজ বানিয়ে দাও